শিক্ষা ঐক্য প্রগতি


শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড

Email : rahmanmunju@gmail.com

header ads
                                                                ‘প্রিয় বাংলাদেশ’                                                                   

মুক্তিযুদ্ধ আমি কি তোমায় ভুলিতে পারি

মুক্তিযুদ্ধ :

মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে একটি জাতি বা গোষ্ঠীর মুক্তি বা স্বাধীনতা লাভের লড়াই। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ হয়।এ যুদ্ধটি সংঘটিত হয়েছিল পূর্ব বাংলর জনগনের সাথে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর।পূর্ব বাংলার জনগনের উপর পাকিস্তানীদের দুই যুগের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক শাসন-শোষন, লাঞ্চনা-বঞ্চনা, অন্যায়-অবিচার এবং বাঙালীর সামাজিকতা ও সংস্কৃতিক বঞ্চনার বিরুদ্ধে। যার ফলশ্রুতিতে পূর্ব বাংলার জনগনকে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনী এ দেশের মানুষের উপর স্বশস্ত্র আক্রমন ও গনহত্যা শুরু করলে আনুষ্ঠানিক ভাবে যুদ্ধ শুরু হয়। খুব অল্প সংখ্যক লোক ছাড়া পূর্ব বাংলার সকল জনগন স্বত:স্ফুর্ত ভাবে পাকিস্তানীদের বিরুদ্ধে সার্বিক ভাবে মোকাবেলা করার জন্য ঝাপিয়ে পড়ে। বাঙালীর শোষন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে যুদ্ধই ছিল মুক্তিযুদ্ধ।


মুক্তিযোদ্ধা
Add caption


মুক্তিযোদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধ কখন শুরু হয় : 

মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোন যুদ্ধ নয়। পৃথিবীর কোন মুক্তিযুদ্ধই একটি ঘোষনা বা একটি আক্রমনের মাধ্যমে সূচিত হয়নি। মুক্তি লাভের চেতনা বিকাশ, জনগনের মধ্যে মুক্তির ধারনা ও স্বরূপটি প্রতিষ্ঠা করা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম অংশ। এই অংশটি দীর্ঘ দিন ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠনের মাধ্যমে ব্যাক্ত বা চিন্তার প্রকাশ।যা বিভিন্ন কর্মসূচি ও আন্দোলনের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। বস্তুত: পাকিস্তান সৃষ্টির পর পর তার চরিত্র ্ও কার্যকলাপ এদেশের মানুষের আশা আকাংখার বিপরীত স্রোতে বহিবার সাথে সাথে এই অংশের সূচনা হয়। ২৪ বছরে তা আস্তে আস্তে পরিপক্কতা অর্জন করে। তাই ৫২ র ভাষা আন্দোলন, ৬২ র শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ র ছয়দফা আন্দোলন, ৬৯ এর অভ্যূত্থান, ৭০ এর নির্বাচনের কোনটাই বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে গভীর ভাবে সম্পৃক্ত। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বশস্ত্র পর্বটির সূচনা হয় ১৯৭১ সালের মার্চের শুরুতেই পাকিস্তানী ও তাদের দোসরদের বিচ্ছিন্ন আক্রমনের মাধ্যমে। এখানে উল্লেখ্য যে, ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষনেও এই আক্রমন ও হত্যাযজ্ঞের কথা বলা হয়েছে। ২৫ শে মার্চ রাতে পাকিস্তানী বাহিনী ব্যাপক আক্রমন শুরু করলে মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক রূপটি প্রকাশিত হয় এবং এ দেশবাসী স্বশস্ত্র সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে। ফলে ১৯৭১ সালে ২৫ শে মার্চ রাতে থেকে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।


অভ্যূত্থান ঘটে :

১৯৭১ সালে ২৬শে মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনায় দেশের সকল এলাকায় স্বাধীনতার জন্য স্বত:স্ফুর্ত অভ্যূত্থান গড়ে উঠে। এই অভ্যূত্থানে অংশ নেয় সরকারী কর্মকর্তা - কর্মচারী, রাজনৈতিক কর্মী, ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক,পেশাজীবী নির্বিশেষে সকল শ্রেনীর মানুষ। পাক-বাহিনীর আক্রমন ও গনহত্যা মোকাবেলার জন্য গড়ে তোলা প্রতিরোধ প্রাথমিক পর্যায়ে স্বল্প স্থায়ী হয়। শত্রুসেনারা সংখ্যায় অনেক ও তারা ছিল অনেক অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত। তাই মুক্তিযুদ্ধারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতে চলে যায়। শিঘ্র্রই দেশের বিভিন্ন অংশে বিচ্ছিন্ন মুক্তি সংগ্রামীদের এক একটি কমান্ডের অধীনে এনে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলা হয়।পাকিস্তানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি আরও অনেক বাহিনী অংশ নেয়। এ সকল বাহিনীর মধ্যে - টাঙ্গাইলের কাদের বাহিনী, সিরাজগঞ্জে লতীফ বাহিনী, ঝিনাইদহে আকবর হোসেন বাহিনী, ফরিদপুরে হেমায়েত বাহিনী, বরিশালে কদ্দুস মোল্লা বাহিনী ও গফুর বাহিনী, ময়সনসিংহে আফছার বাহিনী ও আফতার বাহিনী এবং বরিশালে সর্বহারা পার্টির নেতা সিরাজ শিকদার বাহিনী উল্লেখযোগ্য।এ সকল বাহিনী স্থানীয় ভাবে সংগঠিত হয়ে নিজেদের শক্তিতে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি লড়াইয়ে লিপ্ত হয়।ভারতের সেনাবাহিনীর গেরিলা যুদ্ধ বিশেষজ্ঞ মেজর জেনারেল ’ওবানের ‘ সক্রিয় সহযোগীতায় ”মজিব বাহিনী” নামে একটি বাহিনী গঠিত হয়। এই মজিব বাহিনীর সদস্যদের দেরাদুনে প্রশিক্ষন দেয়া হয়। ছাত্রলীগ নেতা শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমেদ, আব্দুর রাজ্জাক এবং সিরাজুল আলম খান এই বাহিনীর সংগঠক ছিলেন।

   মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত ও অনিয়মিত দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। অনিয়মিত বাহিনী ’গন-বাহিনী’ নামে পরিচিত। নিয়মিত বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত ছিল ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্ট ও পূর্ব পাকিস্তানের রাইফেলসের সৈন্যরা। এছাড়া ছাত্র, কৃষক, শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মীদের প্রাথমিক প্রশিক্ষন দিয়ে অনিয়মিত বাহিনীর অন্তর্ভূক্ত করা হয়। এরা গেরিলা যুদ্ধের জন্য নিয়োজিত ছিল। আর নিয়মিত বাহিনীরা জেডফোর্স, এসফোর্স, কে ফোর্স নামে গঠিত হয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ গ্রহন করে। এছাড়া বিমান ও নৌ-বাহিনী গঠন করা হয়। তারাও সক্রিয় ভাবে যুদ্ধে অংশ নেয়।তাই সবার সন্মিলিত ভাবে যুদ্ধের ফলে বাংলাদেশের অভ্যূত্থান ঘটে।


মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর :

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করার জন্য কিছু সামরিক কৌশল অবলম্বন করা হয়।সমগ্র দেশকে ভৌগলিক এলাকা ভেদে ১১ টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয় এবং প্রতিটি সেক্টরে একজন করে সেক্টর কমান্ডার বা অধিনায়ক নিয়োগ করা হয়। সেক্টর গুলো হচ্ছে -

১নং সেক্টর :  চট্রগ্রাম ও পার্বত্য পট্রগ্রাম জেলা এবং নোয়াখালী জেলার মুহুরী নদীর পূর্বাংশের সমগ্র এলাকা নিয়ে গঠিত।এ সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল হরিনাতে। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান এবং পরে হন মেজর রফিকুল ইসলাম।

২নং সেক্টর : ঢাক, কুমিল্লা, ফরিদপুর এবং নোয়াখালী জেলার অংশ নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। এর হেডকোয়ার্টার ছিল আগরতলার ২০ মাইল দক্ষিনে মেলাঘরে। আর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর খালেদ মোশারফ এবং পরে হন মেজর এ,টি,এম হায়দার।

৩নং সেক্টর : উত্তরে চূড়ামনা কাঠি থেকে সিলেট এবং দক্ষিনে ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়ার সিঙ্গারবিল পর্যন্ত এলাকা নিয়ে গটিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর কে এম শফিউল্লাহ এবং পরে মেজর এ এন এম নূরুজ্জামান। হেডকোয়ার্টার ছিল হেজামারা।

৪নং সেক্টর : উত্তরে সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মুহাকমা থেকে দক্ষিনে কানাইঘাট থানা পর্যন্ত ১০০ মাইল বিস্তৃত সীমান্ত এলাকা নিয়ে গঠিত। সেলেটের ইপিআর বাহিনীর সৈন্যদের সঙ্গে ছাত্র মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয়ে এ সেক্টর গঠিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর চিত্তরঞ্জন দত্ত এবং পরে ক্যাপ্টেন এ রব। হেডকোয়ার্টার ছিল প্রথমে করিমগঞ্জ এবং পরে আসামের মাসিমপুরে।

৫নং সেক্টর : সিলেট জেলার দুর্গাপুর থেকে ডাউকি ( তামাবিল ) এবং জেলার পূর্বসীমা পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা নিয়ে গঠিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর শওকত আলী । হেডকোয়ার্টার ছিল বাঁশতলায়।


৬নং সেক্টর : সমগ্র রংপুর জেলা এবং ‍দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মুহাকুমা নিয়ে গঠিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন উইং কমান্ডার এম খাদেমুল বাশার। হেডকোয়ার্টার ছিল পাটগ্রামের নিকটবর্তী বুড়িমারীতে।

৭নং সেক্টর : রাজশাহী, পাবনা, বগুড়া এবং ‍দিনাজপুর জেলার দক্ষিনাংশ নিয়ে গঠিত হয়। সেক্ট কমান্ডার ছিলেন মেজর নাজমুল হক এবং পরে সুবেদার মেজর এ রব এবং মেজর কাজী নূরুজ্জামান। হেডকোয়ার্টার ছিল বালুরঘাটের নিকটবর্তী তরঙ্গপুর।

৮নং সেক্টর : কুষ্টিয়া, যোশর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর ও পটুয়াখালী জেলা নিয়ে গঠিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী এবং পরে মেজর এম মন্জুর। হেডকোয়ার্টার ছিল কল্যানীতে।

৯নং সেক্টর : বরিশাল ও পটুয়াখালী জেলা এবং খুলনা ও ফরিদপুর জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম জলিল এবং পরে মেজর এম এ মন্জুর ও মেজর জয়নাল আবেদীন।

১০নং সেক্টর : নৌ-কমান্ডো বাহিনী নিয়ে এই সেক্টর গঠিত হয়। এই বাহিনী গঠনের উদ্যোক্তা ছিলেন ফ্রান্সে প্রশিক্ষনরত পাকিস্তান নৌবাহিনীর আট জন বাঙালী নৌ-কর্মকর্তা ।এদের নেতৃত্ব দেন এম এন সুমন্ত। এদের কাজ ‍ছিল শত্রু বাহিনীর সমূদ্র উপকূলীয় এলাকায় জাহাজ ধ্বংস করা। এরা অপানেশন চালিয়ে বিভিন্ন জাহাজ ধ্বংস করেন।

১১নং সেক্টর : টাঙ্গাইল জেলা এবং কিশোরগঞ্জ মুহাকমা ব্যতীত সমগ্র ময়মনসিংহ জেলা নিয়ে গঠিত। সেক্টর কমান্ডার ছিলেন মেজর এম আবু তাহের । আবু তাহের গুরুতর আহত হলে পরে স্কোযাড্রন লীডার হামিদূল্লাহকে দায়িত্ব দেয়া হয়। এ সেক্টরের হেডকোয়ার্টার ছিল মহেন্দ্র্রগঞ্জ।

মুক্তিযুদ্ধ ছিল এক বিরল ঘটনা । এই মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের জনগনের বেঁচে থাকার লড়াই। এই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পেরেছিল। যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সোনার অক্ষরে লেখা থাকবে।তাই বলা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ আমি কি তোমায় ভুলিতে পারি।



Post a Comment

0 Comments