শিক্ষা ঐক্য প্রগতি


শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড

Email : rahmanmunju@gmail.com

বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ইতিহাস

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। এ স্বাধীনতা এমনি এমনি অর্জিত হয় নাই। এর পিছনে বহু ত্যাগ তিতিক্ষা, প্রানহানী, রক্তপাত ও দু:খ কান্না বিজড়িত।দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত এবং ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। বঙ্গ শব্দটি প্রাচীন কালে একটি গোষ্ঠীর নাম ছিল।এই বঙ্গ থেকে বাঙ্গালা নামের উৎপত্তি। কালক্রমে এই বাঙ্গালা নামটি বর্তমানে বাংলাদেশ নামকরন হয়েছে। এই বাংলাদেশের স্বাধীনতর বিজ বপিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্যে। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলন, ৫৪ র যুক্তফ্রন্ট গঠন, ৬৬ র ছয়দফা আন্দোলন, ৬৯ র গন- অভ্যূত্থান, ৭০ সালের সাধারন নির্বাচন, বঙ্গবন্ধুর ৭মার্চে ভাষন ইত্যাদি ঘটনা প্রবাহের মাধ্যমে ১৯৭১ সালে ১৬ই ডিসেন্বর বিজয় অর্জনের ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটে। যা পর্যাক্রমে নিচে বর্নিত হলো।

১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস

১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন :

১৯৫২ সালে ২৭ জানুয়ারী খাজা নাজিমউদ্দিন পূর্ববাংলা সফরে এসে পল্টন জনসভায় ঘোষনা দেন যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। তার এই ঘোষনায় ছাত্র-শিক্ষক-বুদ্ধিজীবি মহলে তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।খাজা নাজিমউদ্দিনের উক্তির প্র্রতিবাদে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০ জানুয়ারী ছাত্র ধর্মঘট ও সভা আহবান করেন। উক্ত সভায় ৪ ফেব্রুয়ারী, ১৯৫২ ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘট , বিক্ষোভ মিছিল ও ছাত্রসভা অনুষ্ঠানে সিদ্ধান্ত গ্রহন করা হয়। তার আগে ভাষা আন্দোলনকে ব্যাপকতর করার উদ্দেশ্যে ৩১ জানুয়ারী বিকেলে ঢাকায় বার লাইব্রেরিতে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা ভাষানীর সভাপতিত্বে এক সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তমদ্দুন মজলিশ, ইসলামী ভ্রাতৃসংঘ, যুব সংঘ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম আওয়ামী লীগ প্রভৃতি সংগঠনের প্রতিনিধি সমন্বয়ে কাজী গোলাম মাহবুবকে আহবায়ক করে ২৮ মতান্তরে ৪০ সদস্য বিশিষ্ট ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়।উক্ত পরিষদ ৪ ফেব্রয়ারীর কর্মসূচী সমর্থন করে এবং ২১ শে ফেব্রয়ারী সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল, বিক্ষোভ মিছিল ও জনসভার কর্মসূচী ঘোষনা করে। ফলে সরকার ২০ ফেব্রুয়ারী রাত থেকে এক মাসের জন্য ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করে। এর  মাধ্যমে ঢাকায় যে কোন প্রকার সভা, সমাবেশ,শোভাযাত্রা, বিক্ষোভ মিছিল নিষিদ্ধ ঘোষনা করা হয়। কিন্তু সরকারের এ ঘোষনাকে অপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা মিছিলে ঝাপিয়ে পড়ে। সরকার মিছিলে গুলি চালায়। ফলে রফিক, শফিক, ছালাম, বরকত, জব্বার মৃত্যুবরন করে।১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রয়ারী রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বার প্রমুখের আত্মহুতির মাধ্যমে ভাষা আন্দোলন চুড়ান্ত রূপ লাভ করে।

যুক্তফ্রন্ট গঠন : 

১৯৫৪ সালের সাধারন নির্বাচন ও যুক্তফ্রন্ট গঠন পূর্ব বাংলার ইতিহাসে অতিব গুরুত্বপূর্ন ঘটনা। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার কর্তৃক ১৯৫৪ সালের ৪ ডিসেম্বর মুসলিম লীগ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো - কৃষক-শ্রমিক পার্টি, আওয়ামী মুসলীম লীগ, নেজামে ইসলামী ইত্যাদি দল একত্রিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট একটি নির্বাচনী জোট একতাবদ্ধ হয়। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী প্রতীক ছিল ‘নৌকা’।শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আব্দুল হামিদ খার ভাষানী, শেখ মুজিবুর রহমান ও হোসেন সোহরাওয়ার্দী ছিলেন যুক্তফ্রন্ট এর প্রথম সারির নেতা।

ছয়দফা আন্দোলন :

১৯৬৬ সালের ছয়দফা কর্মসূচী ভিত্তিক আন্দোলন বাঙালী জাতির জীবনে এক তাৎপর্যপূর্ন  ঘটন। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগষ্ট পাকিস্তান নামক সার্বভৌম রাষ্ট্রের উদ্ভব হলেও পূর্ব পাকিস্তান কিন্তু অশুভ শাসনের কালো হাত থেকে মুক্তি পায়নি। পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে সুদীর্ঘ ২৪ বছর পর্যায়ক্রমে শোষন করে। তাই পশ্চিম পাকিস্তানের এ পরিকল্পিত শোষনের হিংস্র দাবানল থেকে মুক্তির জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী ঔতিহাসিক ছয়দফা কর্মসূচী ঘোষনা করেন। যা বাঙালী জাতির জীবনে পাকিস্তানের রাজনৈতিক বিবর্তনে এক অনন্য সাধারন ভূমিকা পালন করে ছিল।

৬৯ এর গন-অভূত্থান :

১৯৬৯ সালের গন-অভূত্থান এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা। র্পব বাংলার জনগন যখন পশ্চিমা শাসক গোষ্ঠী কর্তৃক শোষন নীতি ও বঞ্চনার স্বীকার তখন ১১ দফার ভিত্তিতে তদানীন্তন পূর্ব বাংলার বিপ্লবী ছাত্র সমাজ ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারী শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এক অপ্রতিরোধ্য ও দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলে। ফলে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে চরম ভাবাপন্ন হয়ে উঠে এবং পরিশেষে তা গন-অভূত্থানে রূপ নেয়।

৭০ এর সাধারন নির্বাচন :

১৯৭০ সালের সাধারন নির্বাচন হচ্ছে এক সার্বজনীন প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান ভিত্তিক প্রথম নির্বাচন। বাঙালী জাতির ইতিহাসে ১৯৭০ এর নির্বাচনই প্রথম স্বাধীন , অবাধ ও ‍নিরপেক্ষ নির্বাচন। এ নির্বাচনের মাধ্যমেই বাঙালী জাতি প্রথমবারের মত আত্মপ্রতিষ্ঠার ও স্বায়ত্বশাসনের সুযোগ সৃষ্টির পথ সুগম করে। এ নির্বাচনের ফলাফল যেমন চমকপ্রদ, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয়ের ক্ষেত্রেও প্রভাব অপরিসীম। এই নির্বাচনের ফলাফলের প্রেক্ষিতেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অবিশ্বাস ও বৈরী আচরনের ফলে পূর্ব বাংলাকে স্বাধীনতা যুদ্ধে অবতীর্ন হতে বাধ্য করা হয়েছে। সুতরাং এটি পরিস্কার যে ,১৯৭০ এর নির্বাচন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ঘটনা।

ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষন :

অসহযোগ আন্দোলনের প্রবাহমান গতিধারায় সমগ্র বাঙালী যখন উদ্বেলিত, ঠিক সে সময়ে আন্দোলনের গতিধারাকে আরও বেশি জোরদার করার জন্য এবং আন্দোলনের ভবিষ্যৎ কর্মসূচী ঘোষনা করার জন্য আওয়ামী লীগ ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বেলা ৩ ঘটিকায় রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করে। উক্ত জনসভায় উপস্থিত ১০ লক্ষের বেশী জনগনের সামনে শেখ  ‍মুজিবুর রহমান দীপ্ত কন্ঠে যে ঘোষনা প্রদান করেন তা বাঙালী জাতির ইতিহাসে স্বরনীয় দলিল হিসাবে এবং সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ভাষন হিসাবে খ্যাত হয়ে থাকবে। তিনি জনতাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, বাঙালীর ইতিহাস শোষন, বঞ্চনা ও রক্তঝরানোর ইতিহাস। বাঙালীরা যখনই ক্ষমতায় যেতে চেয়েছে, তখনই চলছে চক্রান্ত।ক্ষমতায় গিয়েও বাঙালীরা ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। বাঙালী যখন ন্যায্য দাবির কথা বলতে চেয়েছে তখনই তাদের বুকের উপর চালানো হয়েছে গুলি। তিনি ঘোষনা করেন- “এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম”। তিনি আরো বলেন - “রক্ত যখন দিয়েছি তথন রক্ত আরও দেব, দেশকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ”। তিনি জনগনের প্রতি আহবান জানান, “ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল, তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেল করতে হবে।” ঐক্যবদ্ধ জনতা তার  উদাত্ত আহবানকে স্বাগত জানায় এবং দেশের জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকারের প্রতিশ্রুতি দেয়।

২৫ মার্চ , ১৯৭১ কালরাত্রি :

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাঙালী জাতির জীবনে এক কালরাত্রি, দুর্বিসহ স্মৃতি বিজড়িত এক তমসাচ্ছন্ন দিন।এদিন রাত্রি সাড়ে দশটার পর পাকিস্তানের প্রশিক্ষিত সামরিক বাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলকে স্তব্ধ করার জন্য হিংস্রতা আর নারকীয় হত্যাকান্ডের সূচনা করে সারাদেশে। বাঙালীর জীবনে নেমে আসে ঘোর অমানিশা। অবশেষে নিরস্ত্র  বাঙালী জাতি যার যা ছিল তা নিয়ে ঝাপিয়ে পড়ে পাকিস্তানী হানদার বাহিনীর উপর এবং শত্রুকে মোকাবেলা করে।

২৬ মার্চ , ১৯৭১ স্বধীনতা ঘোষনা :

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে বন্দী হওয়ার পূর্বক্ষনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষনার একটি লিখিত বানী চট্রগ্রামের জহুর হোসেনসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের নিকট প্রেরন করার ব্যবস্থা করেন। চট্রগ্রাম বেতার কেন্দ্র এ সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছিল। ২৬ মার্চ, ১৯৭১ দুপুর আড়াইটায় চট্রগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক এম, এ হান্নান চট্রগ্রাম কালুরঘাট ট্রান্সমিশন সেন্টার থেকে বঙ্গবন্ধুর এই স্বধীনতার ঘোষনা পাঠ করেন এবং সর্বশক্তি দিয়ে পশ্চিমা হানাদার বাহিনীর মোকাবেলা করার জন্য উদাত্ত আহবান জানান। এ বেতার কেন্দ্র থেকেই অষ্টম রেজিমেন্ট এর মেজর (পরে লে: জেনারেল) জিয়াউর রহমান ২৭, ২৮ ও ৩০ মার্চ  পরপর তিনটি ঘোষনা মহান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর পক্ষে বিশ্ববাসীর কাছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা জানিয়ে দেন।

২৫ মার্চ ১৯৭১ সালে দিবাগত রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী বাংলার ঘুমন্ত জনগোষ্ঠীর উপর  যে হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসাত্মক অভিযান শুরু করে ছিল, তা তাৎক্ষনিক ভাবে বাংলার জনগন ঝাপিয়ে পড়ে মোকাবেলা করে।দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লক্ষ মানুষের প্রান ও ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভমের বিনিময়ে বাঙালী জাতির আরাধ্য স্বাধীনতা অর্জিত হয়। ১৬ ই ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পরাজিত পাকিস্তানী বাহিনী রেসকোর্স ময়দানে ( বর্তমানে সোওরাওয়ার্দী উদ্যান ) আত্মসমর্পনের মাধ্যমে চুড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয় এবং স্বধীন বাংলাদেশের অভ্যূদয় ঘটে।

Post a Comment

0 Comments