শিক্ষা ঐক্য প্রগতি


শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড

Email : rahmanmunju@gmail.com

header ads
                                                                ‘প্রিয় বাংলাদেশ’                                                                   

শারদীয়া দূর্গা পূজার কথা

দূর্গা পূজা :

হিন্দু শাস্ত্রে ‘দূর্গা’ নামটির ব্যাখ্যা হলো- ‘দ’ অক্ষর দৈত্যনাশক, ‘উ’কার বিঘ্ননাশক. ‘রেফ’ রোগনাশক, ’গ’ অক্ষর পাপনাশক ও অ-কার ভয়নাশক, অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ্ও ভয় শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন তিনিই ’দূর্গা’। অন্য দিকে শব্দকল্পদ্রুম অনুসারে “দূর্গাং নাশয়তি যা নিত্যং যা দূর্গা বা প্রকীর্তিতা” অর্থাৎ দূর্গা নামক অসুরকে যিনি বধ করেন তিনিই নিত্য দূর্গা নামে অভিহিতা। আবার শ্রী শ্রী চন্ডি অনুসারে এই দেবীই ” নি:শেষ দেবগন শক্তি সমূহ মুর্ত্যাঃ বা সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তির প্রতিমুর্তি। আর পূজা শব্দের অর্থ আরাধনা বা অর্চনা করা। মোট কথা অসুরকে বধ করার জন্য যে পূজা বা অর্চনা করা হয় তাই দূর্গা পূজা। সাধারনত: আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের ষষ্ঠ থেকে দশমী দিন পর্যন্ত শারদীয়া দূর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এই পাঁচটি দিন যথাক্রমে “দূর্গাষষ্ঠী”, ”মহাসপ্তমী”, মহাষ্টমী,  ”মহানবমী” ও ”বিজয়া দশমী” নামে পরিচিত।আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষটিকে বলা হয় “দেবীপক্ষ”। দেবী পক্ষের সূচনা অমাবস্যাটির নাম মহালয়া। এই দিন হিন্দুরা তর্পন করে তাদের পূর্ব পুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মহালয়া থেকে শুরু করে বিজয়া দশমী পর্যন্ত ’দূর্গা পূজা’ চলে।

দূর্গ পূজা

দূর্গা পূজা

দূর্গা পূজার প্রচলন :

ব্রক্ষ্মবৈবর্ত পুরানে বলা হয়েছে কৃষ্ণ হচ্ছে দূর্গা পূজার প্রবর্তক।বিভিন্ন দেবদেবীরা কিভাবে দূর্গা পূজা করে ছিলেন তার একটি তালিকা পাওয়া যায় এই পুরানে। ”সৃষ্টির প্রথম যুগে পরমাত্মা কৃষ্ণ বৈকুন্ঠের আদি বৃন্দাবনের মহারাসমন্ডলে প্রথম দূর্গা পূজা করেন।এরপর মধু ও কৈটভ নামে দুই অসুরের ভয়ে ব্রক্ষ্মা দ্বিতীয় পূজা করেন। ত্রিপুর নামে এক অসরের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে শিব বিপদে পড়ে তৃতীয় দূর্গা পূজার আয়োজন করেন। দুর্বাসা মুনির অভিশাপে লক্ষ্মীকে হারিয়ে ইন্দ্র যে পূজার আয়োজন করে ছিলেন তা ছিল চতুর্থ দূর্গাপূজা। এরপর থেকে পৃথিবীতে মুনি রিষি, সিদ্ধ পুরুষ, দেবতা ও মানুষের নানা দেশে নানা সময়ে দূর্গা পূজা করে আসছেন।

দূর্গা পূজার মন্ত্র : 

সনাতন ধর্মের যে কোন পূজার ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা রাখে সংস্কুত মন্ত্রগুলি। দূর্গা পূজার মন্ত্রগুলি সাধারনত: শ্রী শ্রী চন্ডি থেকে পাঠ করা হয়। ঢাক ঢোল, খোল, করতাল, সুগন্ধী, আগরবাতি তার সাথে এই সংস্কৃত মন্ত্র গুলি এক পবিত্র পরিবেশের জন্ম দেয়। দূর্গা পুষ্পাঞ্জলি দেয়ার মন্ত্র : 
” ্ঔঁ জয়ন্তি মঙ্গলা কালী, ভদ্র কালী কপালিনী, দূর্গা শিব ক্ষমা ধাত্রী, স্বাহা স্বধা নমস্তুতে।এস স্ব চন্দন পুষ্প বিল্ব পত্রাঞ্জলী নম ভগবতী দূর্গা দেবী নমহ্।” 
দূর্গা প্রনাম মন্ত্র : “সর্ব মঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থ সাধিকে সরন্যে এস্বকে গৌরি নারায়নী নমস্তুতে”। অর্থ: হে দেবী সর্ব মঙ্গলা, শিবা, সকল কার্য সাধিকা. শরনযোগ্য, গৌরি ত্রিনয়নী, নারায়নী তোমাকে নমস্কার।

বাংলায় দেবী দূর্গা :

বাংলায় দেবী দূর্গার যে মুর্তিটি সচারচন দেখা যায় সেটি পরিবার সমন্বিতা বা সপরিবার দূর্গার মুর্তি। এই মুর্তির মধ্য স্থলে দেবী দূর্গা সিংহবাহিনী ও মহিষাসুরমর্দীনী; তার মকুটের উপরে শিবের ছোট মুখ, দেবীর ডান পাশে উপরে দেবী লক্ষ্মী ও নীচে গনেশ; বামপাশে ‍উপরে দেবী সরস্বতী ও নীচে কার্তিকেয়। সাবর্ন রায়চৌধুরী পরিবার ১৬১০ সালে এই সপরিবার দূর্গার প্রচলন করেন।এলাকাভেদে দূর্গার সপরিবার বিন্যাস ভিন্নতা দেখা যায়। তবে দূর্গার রূপ কল্পনা বা কাঠামো বিন্যাসে যতই বৈচিত্র থাকুক না কেন, বাংলায় দূর্গোৎসবে প্রায় সর্বত্রই দেবী দূর্গা সপরিবারে পূজিতা হন।এই প্রসঙ্গে স্বামী প্রমেয়নান্দের উক্তিটি স্বরনীয় : ..ধনদাত্রী লক্ষ্মী, বিদ্যাদায়িনী সরস্বতী, শৌর্য-বীর্যের প্রতীক কার্তিকেয়, সিদ্ধিদাতা গনেশ ও তাদের বাহন - সকলের মূর্তিসহ মহামহিমাময়ী দূর্গা মূর্তির পরিকল্পনা ও পূজা বাংলার নিজস্ব।

সিংহ : 

সিংহ হলো দূর্গার বাহন। এছাড়া সিংহ মানুষের পশুত্ব বিজয়ের প্রতীক। স্বামী প্রমেয়নন্দ বলেছেন- “ প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আছে পশুশক্তি। পুরুষ্কার ও সাধন ভজনের দ্বারা মানুষ যখন যথার্থ মনুষত্বে উপনীত হয়, তখন তার পশুভাব কেটে গিয়ে দেবভাব জাগ্রত হয়। আর তখনই সে প্রকৃত শরনাগত হওয়ার যোগ্যতা লাভ করে, সাধক জীবনের অধিকারী হয়। দেবীর চরনতলে সিংহ সেই ভাবেরই প্রতীক।

মহিষাসুর :

মহিষাসুর অসুর অর্থাৎ দেবদ্রোহী। তাই দেবী প্রতীমায় দেবীর পদতলে দলিত এই অসুর । ‘সু’ এবং ‘কু’ এর মধ্যকার চিরকালীন দ্বন্দ্বে অশুভ শক্তির উপর শুভ শক্তির বিজয়ের প্রতীক। মহিষাসুর অসুর হলেও দূর্গোৎসবে মহিষাসুরের চল আছে। কালিকা পুরানে বলা হয়েছে - মৃত্যুর কিছুকাল পূর্বে  নিজের মৃত্যুদৃশ্য স্বপ্নে দেখে ভীত মহীষাসুর ভদ্র কালীকে তুষ্ট করে ছিলেন।ভদ্রকালী তাঁকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি না দিলেও তার ভক্তিতে তুষ্ট হয়ে বরদান করতে ইচ্ছুক হন। কিন্তু মহিষাসুরকে এই বর দেন যে যেখানেই দেবী পূজিতা হবেন, সেখানেই তার চরনতলে মহিষাসুরেরও স্থান হবে।

গনেশ :

গনেশ হচ্ছে কার্যসিদ্ধির দেবতা। হিন্দু পুরানের নিয়ম অনুসারে অন্যান্য  দেবতার আগে গনেশের পূজা করতে হয়।গনেশের পূজা আগে না করলে অন্য কোন দেবতার পূজা করা শাস্ত্রে নিষিদ্ধ। স্বামী প্রমেয়নান্দ লিখেছেন- “গনশক্তি যেখানে ঐক্যবদ্ধ সেখানে কর্মের সকল প্রকার বাধাবিঘ্ন দূরীভূত হয়। দেবাসুর যুদ্ধে দেবতারা যতবরই ঐক্যবদ্ধ হয়ে অসুরের সঙ্গে লড়াই করেছেন ততবারই তারা জয়ী হয়েছেন।গনেশের আরেক নাম বিঘ্নেশ অর্থাৎ বিঘ্ন নাশকারী। বিঘ্নেশ প্রসন্ন থাকলে সিদ্ধি নিশ্চিত”। গনেশের বাহন মুষিক বা ইঁদুর। ইঁদুর মায়া ও অষ্টাপাশ ছেদনের প্রতীক।


লক্ষ্মী :

লক্ষ্মী শ্রী, সমৃদ্ধ বিকাশ ও অভ্যূদয়ের প্রতীক। শুধু ধন ঐষর্যই নয়, লক্ষ্মী চরিত্র ধনেরও প্রতীক। স্বামী নির্মলেনন্দুর ভাষায় -” ধন, জ্ঞান ও শীল- তিনেরই মহনীয় বিকাশ দেবী লক্ষ্মীর চরিত্রমহাত্ম্যে। সর্বাত্মক বিকাশের অধিষ্ঠাত্রী দেবতা বলেই তিনি কমলা। কমল বা পদ্মের ন্যায়ই তিনি সুন্দরী; তদীয় নেত্রদ্বয় পদ্মর ন্যায় আয়ত।তার শুভ করে প্রস্ফুটিত পদ্মকুসুম; পদ্মবনেই তার বসতি। লক্ষ্মীর বাহন প্যাচা। পেচক মুক্তিকামী সাধক।

সরস্বতী :

সরস্বতী হচ্ছে বিদ্যার দেবী। তিনি জ্ঞানশক্তির প্রতীক। “ দেবীর হাতে পুস্তুক ও বীনা। পুস্তুক বেদ শব্দ ব্রক্ষ্ম। বীনা সুরছন্দের প্রতীক নাদব্রক্ষ্ম। শুদ্ধ সত্বগুনের পূর্তি, তাই সর্বশুক্লা। শ্বেতবর্নটি প্রকাশত্মক। সরস্বতী শুদ্ধ জ্ঞানময়ী প্রকাশ স্বরূপ। জ্ঞানের সাধক হইতে হইলে সাধককে হইতে হইবে দেহে মনে প্রানে শুভ্র-সূচি”। সরস্বতীর বাহন হংস। হংস হিন্দদের নিকট পবিত্র প্রতীক। 

কার্তিকেয় :

দেবসেনাপতি কার্তিকেয় বা কার্তিক সোন্দর্য ও শৌর্যবীর্যের প্রতীক। “যুদ্ধে শৌর্যবীর্য প্রদর্শন একান্ত প্রয়োজনীয়। তাই সাধক জীবনে কার্তিকেয়কে প্রসন্ন করতে পারলে শৌর্যবীর্য আমাদের করতলগত হয়। কার্তিকের বাহন ময়ুর। সৌন্দর্য ও শৌর্য কার্তিকেয়র এই  ‍দুই বৈশিষ্ট্য  তার বাহন মযুরের মধ্যে বিদ্যমান।


মহালয়া :

মহালয়া বা পিতৃপক্ষের দিন থেকে মূলত: দূর্গা পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। তবে এ দিনটির তাৎপর্য মূলত: ভিন্ন। এ তিথিকে পিতৃপক্ষও বলা হয়ে থাকে। এ দিনে পিতৃপক্ষের শেষ এবং দেবী পক্ষের শুরু হয়।এই মহালয়া তিথিতে যারা পিতৃ-মাতৃহীন তারা তাদের পূর্বপুরুষদের স্মরন করে। পূর্বপুরুষের আত্মার শান্তি কামনা করে অঞ্জলী প্রদান করেন। সনাতন ধর্ম অনুসারে এই দিনে প্রায়ত আত্মাদের মর্ত্যে পাঠিয়ে দেয়া হয়। প্রয়াত আত্মার যে সমাবেশ হয় তাহাকে মহালয়া বলা হয়।

বিজয়া দশমী : 

বিজয়া দশমীর দিনে সনাতন ধর্মানলন্বীরা অত্যন্ত হৈ হল্লুর , নাচ গান, আনন্দ বিনোদনের মাধ্যমে দূর্গা প্রতিমাকে বিসর্জন দেন। আগামী দিন গুলো যেন তারা পরিবার পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে  থাকতে পারেন এই আশা পোষন করে মা দূর্গাকে শেষ বিদায় জানান।

সনাতন ধর্মাবলন্বীদের নিকট শারদীয়া দূর্গা পূজা হলো সর্ববৃহত পূজা। মহালয়া থেকে শুরু করে টানা নবমী পর্যন্ত তাদের যজ্ঞ চলে। দশমী দিনে তারা দূর্গা মাকে বিসর্জন দেন।তাই তারা শারদীয়া দূর্গা পূজা মহাসমারোহে পালন করে থাকেন।
  

Post a Comment

0 Comments