শিক্ষা ঐক্য প্রগতি


শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড

Email : rahmanmunju@gmail.com

বগুড়ার সূর্যসন্তান : মোহাম্মাদ আলী চৌধুরী

মোহাম্মাদ আলী চৌধুরী :


বগুড়ার হাজারো সূর্যসন্তানের মধ্যে অন্যতম এক নাম হলো মোহাম্মাদ আলী চৌধুরী।তিনি পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।মোহাম্মাদ আলী ১৯০৯ সালে জন্মগ্রহন করেন এবং ১৯৬৩ সালে মৃত্যু বরন করেন। তিনি একাধারে রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক এবং প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে ১৯৫৩ থেকে ১৯৫৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন।তিনি ১৯৫৩ সালের ১৭ অক্টোবর তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন।তৎকালীন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তার অবদান অবিস্বরনীয়। গর্বিত বাঙলার গর্বিত সন্তান এবং বগুড়ার গর্ব কৃতিসন্তান মোহাম্মাদ আলী চৌধুরী অনেক চড়াই উতরাইয়ের পর ১৯৬৩ সালের ২৩ জানুয়ারী মারা যান।

Mohammad Ali
Mohammad Ali


বগুড়ার সূর্যসন্তান মোহাম্মাদ আলীর জীবন ইতিহাস :

মরহুম মোহাম্মাদ আলী চৌধুরী ১৯ অক্টোবর ১৯০৯ সালে বগুড়া জেলার ঐতিহ্যবাহী নবাব পরিবারে জন্মগ্রহন করেন।তিনি একজন রাজনীতিবিদ, কূটনীতিবিদ এবং বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। তাহার পিতা বগুড়ার বিখ্যাত রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবক নবাবজাদা মরহুম সৈয়দ আলতাফ আলী চৌধুরী এবং তাহার মাতার নাম মরহুমা জহুরা খাতুন।তাহার পিতামহ মরহুম নওয়াব আলী চৌধুরী ব্রিটিশ আমলে মুসলিম জাগরনের নেতা ও মন্ত্রী এবং ধনবাড়ির বিখ্যাত নবাব ছিলেন। ৪ ভাই - মোহাম্মাদ আলী, আহম্মদ আলী, হামেদ আলী, মাহমুদ আলী। এর মধ্যে তিনিই জৌষ্ঠ্য।
মরহুম মোহাম্মাদ আলী বাল্যকাল হইতে তিনি তাহার পিতামহ মরহুম নওয়াব আলী চৌধুরীর তত্বাবধানে প্রতিপালিত হন এবং শিক্ষাজীবন শুরু করেন। তিনি বগুড়া করনেশন ইনষ্টিটিউটে কিছুদিন লেখাপড়া করেন। তারপর তাহাকে উন্নত শিক্ষার জন্য কলকাতায় পাঠানো হয়।১৯২৬ সালে তিনি কলকাতা মাদ্রাসা হতে বৃত্তি লাভ করেন এবং কৃতিত্বের সাথে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। অত:পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে কলকাতা ইসলামীয়া কলেজ হতে আই,এ এবং ১৯৩১ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ হতে ইংরেজী বিষয়ে গ্রাজুয়েশন ডিগ্রি লাভ করেন। গ্রাজুয়েশন ডিগ্রী লাভ করার পর তিনি তাহার পিতা নবাবজাদা মরহুম সৈয়দ আলতাফ আলী চৌধুরী এর নির্দেষক্রমে বগুড়ায় ফিরে আসেন এবং পৈতৃক জমিদারীর দায়িত্বভার গ্রহন করেন।

 তিনি তাহার পিতা আলতাফ আলী চৌধুরী ও আব্দুল বারী এর অনুপ্রেরণায় বগুড়ার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তিনি ১৯৩২ খ্রি: বগুড়া মিউনিসিপ্যালেটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ১৯৩৩ খ্রি: বাংলা গভর্নমেন্টের মনোনীত আনারারী ম্যাজিস্ট্র্রেট নিযুক্ত হন।১৯৩৪ খ্রি: বগুড়া জেলাবোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বগুড়া জেলা স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির চেয়ারম্যান নিযাক্ত হন।

১৯৩৭ খ্রি: ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক “খান বাহাদুর” উপাধীতে ভূষিত হন। ঐ বছরেই বগুড়ার নবাব বাড়িতে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি এর সভাপতিত্বে একটি আলোচনা সভায় বগুড়া জেলার মুসলিম লীগ গঠিত হয় এবং বগুড়া জেলার সভাপতি মনোনীত হন। ১৯৪৮ খ্রি: সময় পর্যন্ত তিনি উক্ত দায়িত্ব পালন করেন।১০৩৯ খ্রি: তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসাবে বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন।

মোহাম্মাদ আলী চৌধুরী ১৯৪৪-১৯৪৫ খ্রি: অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমদ্দিনের মন্ত্রীসভায় পার্লামেন্টরি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন।

১০৪৬ খ্রি: তিনি মুসলিম লীগের মনোনয়ন লাভ করে পুনরায় বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দির মন্ত্রীসভায় অর্থ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।এই সময়ে খন্ডকালীন সময়ের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ এবং নদীয়ায় যক্ষা হাসপাতাল স্থাপন করেন।

১০৪৭ খ্রি: পাকিস্তান গঠনের পর মোহাম্মাদ আলী বগুড়া পাকিস্তানের গনপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৪৮ খ্রি: তিনি রেঙ্গুনের রাষ্ট্রদূত ছিলেন।
১৯৪৯ খ্রি: তিনি কানাডায় পাকিস্তানের হাইকমিশনার পদে নিযুক্ত হন এবং ১৯৫২ খ্রি: তিনি যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন।

১৯৫৩ খ্রি: তিনি ১৭ এপ্রিল পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ দেশে সৃষ্ট রাজনৈতিক জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে তাহাকে প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহনের আমন্ত্রন জানান এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহন করেন।প্রধানমন্ত্রী হবার ঠিক আগে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী হবার পর তিনি সংবিধান প্রনয়নকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেন এবং ছয় মাসের মধ্যে সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত একটি সূত্র আইনসভায় পেশ করেন। তার এই সূত্রটি পাকিস্তানের ইতিহাসে “বগুড়া ফর্মুলা” নামে পরিচিত।৭ অক্টোবর ১৯৫৩ খ্রি: “বগুড়া ফর্মুলা” টি আইনসভায় পেশ করা হয়। তের দিন ধরে এর উপর আলোচনা চলে।১৪ নভেম্বর ১৯৫৩ খ্রি: সংবিধানের খসড়া তৈরির ব্যাপারে একটি কমিটি গঠিত হয়। খসড়া চূড়ান্ত করার পূর্বেই গোলাম মোহাম্মদ আইনসভা ভেঙ্গে দেন। যদিও এসময় মোহাম্মাদ আলী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নতুন আরেকটি মন্ত্রীসভা নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন।

২৬ অক্টোবর ১৯৫৪ খ্রি: তিনি আবার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নেন। তার এই নতুন সরকার নতুন নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দেয়।১৯৫৫ সালের আগস্ট মাসে ভগ্নস্বাস্থের কারনে গোলাম মোহাম্মদ পদত্যাগ করেন।ইস্কান্দার মীর্জা নতুন গভর্নর জেনারেল হন।প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পাকিস্তান ও যুক্তবাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তাহার দায়িত্ব পালনকালে পাকিস্তান সেন্টো ও সিয়েটোর সদস্য লাভ করেন।পরবর্তীতে ১৯৫৫ সালের আগস্ট ৮ তারিখে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা মোহাম্মাদ আলীকে পদত্যাগে বাধ্য করেন।

১৯৫৫ - ১৯৫৯ খ্রি: পর্যন্ত তিনি যুক্তরাষ্ট্রে এবং ১৯৫৯ - ১৯৬২ খ্রি: পর্যন্ত জাপানে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।১৯৬২ খ্রি: তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ইস্তাফা দিয়ে বগুড়ায় ফিরে এসে জাতীয় পরিষদের সদস্য পদ নির্বাচনে প্রার্থী হন এবং পাকিস্তানের সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান প্রবর্তিত মৌলিক গনতন্ত্র প্রথার অধীনে নির্বাচনে অংশ গ্রহন করে জয়ী হন এবং এম, এল এ নির্বাচিত হন। ১৯৬২ খ্রি: ২৩ জুন তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান প্রবর্তিত আইনসভায় যোগদান করেন এবং পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।


মোহাম্মাদ আলীর বিভিন্ন সংগঠনের সাথে সংযুক্ততা :

১. অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদের কাউন্সিলর ( ১৯৩১)
২. ডেপুটি চেয়ারম্যান, পদ্মপাড়া সেন্ট্রাল কো-অপারেটিভ ব্যাংক ( ১৯৩৩)
৩. সদস্য, বেঙ্গল সিল্ক কমেটি (১৯৩৩) , সদস্য বেঙ্গল ওয়াকফ বোর্ড (১৯৩৭)
৪. সদস্য, ইস্টবেঙ্গল রেলওয়ে এ্যাডভাইজারি কমিটি ( ১৯৩৭)
৫. সদস্য, বেঙ্গল এগ্রিকালচার বোর্ড (১৯৩৮)
৬. সদস্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি কোর্ট (১৯৩৮)
৭. ফেলো, কলকাতা বিশ্ববিদ্যায়ল (১৯৩৯)
৮. বাংলা আইন পরিষদের হুইপ (১৯৪৩)
৯. অবিভক্ত বাংলার আইন পরিষদের সদস্য ( ১৯৪৬)
১০. আইন পরিষদের সেক্রেটারি (১৯৪৬)


 উপমহাদেশে এবং দেশ-বিদেশে বগুড়ার মোহাম্মাদ আলীর স্বরনে যেসব স্বাপনার নামকরন ও নির্মান হয়েছে তা হলো :

১. মোহাম্মাদ আলী বগুড়া রোড, করাচী, পাকিস্তান।
২. মোহাম্মাদ আলী হাসপাতাল, বগুড়া।
৩. মোহাম্মাদ আলী স্পোর্টিং ক্লাব, বগুড়া।
৪. মোহাম্মাদ আলী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, শিবগঞ্জ, বগুড়া।
৫. মোহাম্মাদ আলী রোড, বর্তমানে বগুড়া-শান্তাহার রোড নামে পরিচিত।

 

মোহাম্মাদ আলীর ব্যক্তি জীবন :

বগুড়ার মোহাম্মাদ আলী ছিলেন একজন সাদামাটা এবং জ্ঞানগর্ভ মানুষ। তার ব্যক্তি জীবনে দুই স্ত্রী ও দুই সন্তান ছিল। তিনি ১৯৩৩ সালে মরহুমা হামিদা মোহাম্মাদ আলী এবং ১৯৫৫ সালে আলীয়া মোহাম্মাদ আলী এর সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার দুই পুত্র হাম্মাদ আলী ও হামদে আলী ছিল।

এই অসাধারন কৃতিমান মানুষ মোহাম্মাদ আলী ১৯৬৩ সালে ২৩ জানুয়ারী মৃত্যু বরণ করেন।তাকে বগুড়া জেলার নবাব বাড়িতে সমাহিত করা হয়। 

Post a Comment

0 Comments