কক্সবাজার সমূদ্র সৈকত ভ্রমন করি


কক্সবাজার সমূদ্র সৈকত :

কক্সবাজার সমূদ্র সৈকত পৃথিবীর ্একটি দীর্ঘতম সমূদ্র সৈকত। ইহা বাংলাদেশের চট্রগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত। ইহার দৈর্ঘ ১২০ কি: মি:।এখানে রয়েছে বাংলাদেশর বৃহত্তম সামূদ্রিক মৎস বন্দর এবং সাবমেরিন ক্যাবল ল্যান্ডিং স্টেশন।একসময় কক্সবাজর পানোয়া নামে পরিচিত ছিল যার আক্ষরিক অর্থ হচ্ছে হলুদ ফুল।এর আরো একটি নাম হচ্ছে ’পালন্কি’। কক্সবাজার সমূদ্র সৈকত অত্যন্ত মনোরম ও মনমুগ্ধকর পরিবেশে অবস্থিত।যা প্রত্যেক পর্যটক বা ভ্রমন পিপাসুদের দারুন ভাবে আকর্ষন করে।তাই আসুন কক্সবাজার সমূদ্র সৈকত ভ্রমন করি।



Coxs Bazar
Coxs Bazar

অবস্থান :

কক্সবাজার চট্রগ্রাম শহর থেকে ১৫২ কি: মি: দক্ষিনে অবস্থিত।ঢাকা থেকে এর দুরত্ব ৪১৪ কি:মি:। এটি বাংলাদেশর সবচেয়ে বড় পর্যটন কেন্দ্র।বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে সড়ক পথে এবং আকাশ পথে কক্সবাজার যাওয়া যায়। ইহা বঙ্গোপসাগর তীরে অবস্থিত।দৈর্ঘে ১২০ কি:মি: বিস্তির্ন  এলাকা জুড়ে অবস্থিত।


নামকরণ :

কক্সবাজার নামটি নামকরন করা হয়েছে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স এর নাম অনুসারে।কক্সবাজারের আগের নাম ছিল পালন্কি।ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ওয়ারিন্ট হোস্টিং অধ্যাদেশ ১৭৭৩ জারি হওয়ার পর বাংলার গভর্নর হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। তখন হিরাম কক্স পালন্কির মহাপরিচালক নিযুক্ত হন।ক্যাপ্টেন কক্স আরাকান শরনার্থী এবং স্থানীয় রাখাইনদের মধ্যে বিদ্যমান হাজার বছরের পুরানো সংঘাত নিরসনের চেষ্টা করেন এবং শরনার্থীদের পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ন অগ্রগতি সাধন করেন কিন্তু পুরাপরি কাজ শেষ করার আগেই মারা যান।তার অবদান স্বরণীয় করে রাখতে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং নাম রাখা হয় কক্স সাহেবের বাজার।পরবর্তীতে এর পূর্নতা রুপ নেয় কক্সবাজার।


কক্সবাজার পরিভ্রমন :

কক্সবাজার সমূদ্র সৈকত একটি মায়াবী ও রুপময়ী সমূদ্র সৈকত। প্রতিদিন প্রতিক্ষণ এর রুপ পরিবর্তন করে।শীত, বর্ষা, গ্রীষ্ম-বসন্ত এমন কোন সময় নেই যে এর রুপ পরিবর্তন হয় না।যাতে সমূদ্রের চেহারার মিল খুজে পাওয়া যায়।সকালে এক রকম তো বিকালে আরেক রকম।গোধুলি বেলার হাওয়া আর রাতের বেলার আবহাওয়ার বিস্তর ফারাক।তাই তো দেশী বিদেশী পর্যটকদের নিকট ক্যাপ্টেন কক্স এর সমূদ্র সৈকতের এত কদর ও পছন্দনীয়।এ সমূদ্র সৈকতের বৈশিষ্ট্য হলো পুরো সমূদ্র সৈকতটি বালুকাময়, কোথাও কাদার অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।সাগরের উত্তাল জলরাশি, ঝাউবনের সারি কিংবা তপ্ত বালির বিছানা দূর্নিবার আকর্ষনে আপনাকে কাছে টেনে নেবেই। বেলাভূমিতে হাটা, সাগরের জলে রোদ্রস্নান আর সূর্যাস্থের নয়নাভিরাম দৃশ্য গুলো প্রতি মূহুর্তেই আপনাকে দেবে মানসিক প্রশান্তি।অবশ্যই সমূদ্রে নামার আগে সতর্ক থাকুন এবং জোয়ার ভাটার সময় জেনে নিন। না জেনে শুনে সাগরে নামবেন না। কোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আপনি যদি সমূদ্রের পুরো রুপ উপভোগ করতে চান তাহলে আপনাকে অবশ্যই সূর্যউদয় ও সূর্যাস্তের সময় বিচে কাটাতে হবে।
সুন্দর মুহুর্ত গুলোকে স্মৃতিতে ধরে রাখতে চাইলে সরনাপন্ন হতে পারেন বিচ ফটোগ্রাফারদের। ১০০ টাকা থেকে ২৫০ টাকার বিনিময়ে উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের সাথে স্পীডবোটের রাইডে যেতে পারেন।এছাড়া মনকে চাঙ্গা করতে ইনানী বিচ কিংবা হিমছড়ি ঝর্ণা থেকে বেড়িয়ে আসতে পারেন।আরো ঘুরে আসতে পারেন মহেশখালী, কুতুবদিয়া, রামুর বোদ্ধ মন্দির, টেকনাফ এবং সেন্টমার্টিন থেকে।


ভ্রমন পয়েন্ট :

  • লাবণী পয়েন্ট : কক্সবাজার শহর থেকে নিকটের কারণে লাবণী পয়েন্ট কক্সবাজারের প্রধান সমূদ্র সৈকত বলে বিবেচনা করা হয়।এখানে নানা রকমের জিনিসের পসরা সাজিয়ে ছোট বড় অনেক দোকান রয়েছে যা পর্যটকদের দারুন ভাবে আকর্ষন করে।
  • হিমছড়ি : হিমছড়ি কক্সবাজার থেকে ১২ কি:মি: দক্ষিনে অবস্থিত।পাহাড় আর ঝর্ণা এখানকার প্রধান আকর্ষন।কক্সবাজার থেকে হিমছড়ি যাওয়ার পথে বামদিকে সবুজঘেরা পাহাড় আর ডানদিকে সমূদ্রের নীল জলরাশী মনোমুগ্ধকর দৃশ্যের সৃষ্টি করে। বর্ষার সময়ে হিমছড়ির ঝর্ণাকে অনেক বেশি জীবন্ত ও প্রানবন্ত বলে হনে হয়।হিমছড়ির পাহাড়ের চূড়ায় একটি রিসোর্ট আছে যেখান থেকে সাগরের দৃশ্য অপার্থিব বলে মনে হবে। অর্থাৎ এখান থেকে সম্পূর্ন সমূদ্র এক নজরে দেখা যায়।
  • ইনানী বিচ : কক্সবাজার সমূদ্র সৈকত সংলগ্ন আরেকটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে যা পর্যটকদের জন্য আকর্ষনীয় বিষয়। তা হচ্ছে ইনানী বিচ তথা ইনানী সমূদ্র সৈকত। ইহা কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৮ কি:মি: দক্ষিনে অবস্থিত।অভাবনীয় সৌন্দর্যে ভরপুর এই সমূদ্র সৈকতটি কক্সবাজার থেকে যেতে আধা ঘন্টা সময় লাগে। পরিস্কার পানির জন্য জায়গাটি পর্যটকদের কাছে সমূদ্র স্নানের জন্য উৎকৃষ্ট বলে বিবেচিত।
  • মহেশখালী : কক্সবাজারের আরেকটি আকর্ষনীয় স্থান মহেশখালী। এখানকার পাহাড় পর্বত পর্যকটদের দারুনভাবে আকর্ষন করে। অত্যন্ত মনোরম ও মনমুগ্ধকর যা না দেখলে মিস করবেন। সময় থাকলো এক পাক ঘুরে আসুন।
  • সেন্টমার্টিন : কক্সবাজার ভ্রমনে গেলে সেন্টমার্টিন না দেখলে আপনার ভ্রমন অসম্পূর্ন থেকে যাবে। সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। যা টেকনাফ উপজেলায় অবস্থিত। ইহা বঙ্গোপসাগরের মাঝে অবস্থিত।সাগরের অপরুপ দৃশ্য সেন্টমার্টিককে সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে। যার নৈসর্গিক দৃশ্য আপনাকে অন্য জগতে নিয়ে যাবে। তাই কক্সবাজার গেলে সেন্টমার্টিনে অবশ্যই একবার যাবেন। বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন।


কক্সবাজার ভ্রমনে উপযুক্ত সময় :

কক্সবাজার ভ্রমনের জন্য সবাই শীতকালকেই বেছে নেয়। কিন্তু না কক্সবাজার এমন একটি জায়গা এখানে যে কোন সময় ভ্রমনে আসতে পারেন। কক্সবাজার সময়ে সময়ে প্রকৃতির রুপ বদলায়। প্রকৃতির সেই রুপের প্রভাব কক্সবাজারকে বিমোহিত করে তোলে।তাই ভিন্ন স্বাধ নিতে নিঝুম বর্ষায় বা শরতের নীল আকাশের সাথে মিতালীর জন্য চলে আসতে পারেন কক্সবাজার।অথবা হেমন্তের পূণির্মার রাতে কক্সবাজারের রুপ আপনাকে বিমোহিত করবে।তবে উপযুক্ত সময় হিসেবে নভেম্ব থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত বেছে নিতে পারেন। কারন এই সময়ে সেন্টমার্টিন যেতে জাহাজ চলাচল করে। অন্য সময়ে সেন্টমার্টিন যেতে হলে স্পীড বোডে যেতে হবে।সেন্টমার্টিন যেতে হলে স্পীড বোডের চেয়ে জাহাজ নিরাপদ।তাই সেন্টমার্টিন গেলে জাহাজে যাওয় আসা উত্তম পন্থা এবং নিরাপদ।

কক্সবাজার যাতায়াত ব্যবস্থা :

ঢাকা থেকে কক্সাবাজার সড়ক, রেল এবং আকাশ পথে যাতায়াত করা যায়।ঢাকা থেকে কক্সাবাজার গামী বাস গুলোর মধ্যে গ্রীন লাইন, হানিফ সৌদিয়া. মডার্ণ, শ্যামলী পরিবহন. সোহাগ পরিবহন সহ ইত্যাদি বাস যোগে যাতায়াত করতে পারবেন।
ট্রেনে কক্সবাজার যেতে চাইলে, কমলাপুর কিংবা বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে সোনার বাংলা, সুবর্ণ এক্সপ্রেস, তূর্ণ-নিশীখা, মহানগর, প্রভাতী ও গোধূলী ট্রেন যোগে কক্সবাজার যাতায়াত করতে পারবেন।
আকাশ পথেও যাতায়াত করতে পারবেন। আকাশ পতে যেতে হলে বাংলাদেশ বিমান, নভোএয়ার, ইউএস বাংলা সহ বেশ কিছু বিমান ঢাকা থেকে সরাসটি কক্সবাজার যাতায়াত করে। এছাড়া আকাশ পথে চট্রগ্রাম এসে সড়ক পথে কক্সবাজার পৌঁছতে পারবেন।

রাত্রী যাপনের ব্যবস্থা :

কক্সবাজার রাত্রী যাপনের জন্য উন্নতমানের ব্যবস্থা আছে। আপনি নিরাপদে থাকতে পারবেন।কক্সবাজার হোটেল গুলোর ধারন ক্ষমতা  প্রায় ১৫০০০০ লোকের। তাই অফ সেজনে বুকিং না দিয়ে গেলেও কোন সমস্যা নেই। কিন্তু পিক আওয়ারে গেলে অর্থাৎ ডিসেম্বরের ১৫ তারিখ থেকে জানুয়ারীর ১৫ তারিখ পর্যন্ত অগ্রিম বকিং দিয়ে যাওয়া ভাল।হোটেলেন মান অনুযায়ী ভাড়া ভিন্ন হয়।

হোটেল : উর্মি গেস্ট হাউজ, কোরাল রীফ, ইকরা বিচ রিসোর্ট, অভিসার, মিডিয়া  ইন, কল্লোল, সেন্টমার্টিন রিসোর্ট ইত্যাদি হোটেল গুলোর ভাড়া ৮০০ টাকা থেকে ৩০০০ টাকা।
হোটেল সী ক্রাউন, সী প্যালেস, সী গাল, নিটোল রিসোর্ট, কোরাল রীফ, বীফ ভিউ ইত্যাদি হোটেল ভাড়া ৩০০০ টাকা থেকে ৬০০০ টাকা।
সায়মন বিচ রেসোর্ড, মারমেইড বিচ রিসোর্ট, ওশেন প্যারাডাইজ, লং বীচ, কক্স টুডে,হেরিটেজ ইত্যাদি হোটেলের ভাড়া ৬০০০ টাকা থেকে ১০০০০ টাকা। এছাড়া অনেক ছোট ছোট হোটল আছে কম ভাড়ায় থাকতে পারবেন। একটু দরদাম করে নিবেন।

খাওয়া দাওয়া :

কক্সবাজারে খাওয়াদাওয়ার বিভিন্ন ধরনে হোটেল ও রেস্টুরেন্টে আছে। মধ্যম মানের হোটেল গুলো ঝাউবন, ধানসিঁড়ি, রোদেলা , নিরিবিলি উল্লেখযোগ্য। এখানে ভাত ২০ - ৪০ টাকা, মিক্সড ভর্তা ৭৫ - ১৫০ টাকা, লাইট্রা ফ্রাই ১০০- ১২০ টাকা ইত্যাদি আইটেমের খাবার রয়েছে। আপনি একটু দরদাম করে নিবেন। এছাড়াও উন্নতমানের হোটেল আছে। সেখানে ভাল খাবার চাইলে খেতে পারেন।দাম একটু বেশী পড়বে।

সতর্কতা :

  • জোয়ার ভাটার সময় মেনে সাগরে নামুন, অন্যথায় বিপদ হতে পারে।
  • হোটেল ঠিক করার আগে হোটেল সম্পর্কে ভালো ভাবে জেনে নিন।
  • কোন রেস্টুরেন্টে খাবার আগে দাম জেনে নিন।
  • কিছু কেনাকাটার আগে দাম জেনে নিন।
  • কোন সমস্যায় পড়লে টুরিস্ট পুলিশের সহযোগিতা নিন।হটলাইন - +০৮৮০১৭৬৯৬৯০৭৪০

সর্বশেষ কথা হচ্ছে ছলনাময়ী ও মায়াবী সমূদ্র সৈকতে স্নান করতে গিয়ে প্রতি বছর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে যা সত্যিই বেদনা দায়ক।তাই জোয়ার ভাটার সময় জেনে সাগরে নামুন। কখনো একা সাগরে নামবেন না।মনে রাখবেন সতর্কের মার নাই।তাই সতর্কতার সহিত ‘কক্সবাজার সমূদ্র সৈকত ভ্রমন করি।

Post a Comment

0 Comments