শিক্ষা ঐক্য প্রগতি


শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড

Email : rahmanmunju@gmail.com

সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমন করি

সেন্টমার্টিন দ্বীপ :
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ হচ্ছে ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপ’। যা মূল ভূখন্ডের সর্ব দক্ষিনে কক্সবাজার জেলা থেকে ১২০ কি: মি: দুরে টেকনাফ উপজেলায় অবস্থিত।এই ক্ষুদ্র দ্বীপটি ১৭ বর্গ কি: মি: জুড়ে অবস্থিত।স্থানীয় ভাষায় সেন্টমার্টিনকে নারিকেল জিন্জিরা বলা হয়। অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যমন্ডিত এ দ্বীপটি বাংলাদেশের অন্যতম পর্যটন স্থান হিসাবে পরিগনিত। নীল আকাশের সাথে সমুদ্রের নীল জলের মিতালী, সারি সারি নারিকেল গাছ এ দ্বীপকে করেছে মহিমান্বিত ও সৌন্দর্যমন্ডিত। যা ভ্রমন পিপাসুদের দুর্বার আকর্ষন করে। তাই আসুন “সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমন করি”।


Sentmartin
Sentmartin


অবস্থান ও সীমানা :

টেকনাফ উপজেলার সর্ব দক্ষিনে বঙ্গোপসাগরের মাঝে সেন্টমার্টিন ইউনিয়নের অবস্থান। উপজেলা সদর থেকে এ ইউনিয়নের দূরত্ব ৪২ কিলোমিটার। এ ইউনিয়নের চতুর্দিকে বঙ্গোপসাগর, তবে উত্তরে টেকনাফ উপজেলার মূল ভূখন্ডের সাবরাং ইউনিয়ন এবং পূর্বে মায়ানমারের মূল ভূখন্ডের রাখাইন প্রদেশ অবস্থিত।


নামকরণ :

চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক শেখ বখতিয়ার উদ্দিন এব মতে, ১৯০০ খ্রিস্টাব্দে দ্বীপটি যখন ব্রিটিশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তখন চট্রগ্রামের জেলা প্রশাসক মার্টিনের নাম অনুসারে এ দ্বীপটির নামকরন করা হয়।

 সেন্টমার্টিন দ্বীপে কি ভাবে পৌঁছবেন :

সেন্টমার্টিন দ্বীপে পৌঁছতে হলে আপনাকে প্রথমে টেকনাফে আসতে হবে।টেকনাফ থেকে জাহাজ অথবা ট্রলারে করে সেন্টমার্টিন পৌঁছতে পারবেন।ঢাকাকে যদি জির পয়েন্ট ধরি তবে ঢাকা থেকে সরাসরি টেকনাফে যেতে পারবেন।আবার ঢাকা থেকে কক্সবাজার হয়েেই টেকনাফে পৌঁছতে পারবেন।ঢাকা থেকে সরাসরি বাসে সার্ভিসের মাধ্যমে টেকনাফ গিয়ে সেখান থেকে জাহাজে বা ট্রলারে করে সেন্টমার্টিন যাওয়া সুবিধাজনক।আর যারা কক্সবাজান ভ্রমন করতে চান তারা ঢাকা থেকে কক্সবাজার গিয়ে কক্সবাজার ভ্রমন শেষে তারপর টেকনাফ যেতে পারেন। এরপর টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন দ্বীপে যেতে পারেন।

ঢাকা থেকে কক্সবাজার হয়ে টেকনাফে যেতে চাইলে, প্রথমে তারা হানিফ, শ্যামলী, সোহাগ, গ্রীন লাইন, টিয়ার ট্রাভেলস, ঈগল, এস আলম, সেন্টমার্টিন প্রভৃতি বাস সার্ভিসের মাধ্যমে কক্সবাজার পৌঁছে কক্সবাজার ভ্রমন শেষে টেকনাফে যেতে পারবেন। বাস ভাড়া শ্রেনি ভেদে ১০০০ থেকে ২৫০০ টাকা মধ্যে পরবে।কক্সবাজার থেকে লোকাল বাস/ মাইক্রো/ জিপ/ সিএনজি ভাড়া করে টেকনাফে যাওয়া যায়। বাস ভাড়া ১৫০ টাকা এবং সিএনজি ভাড়া ২৫০ টাকা নিতে পারে।কক্সবাজার থেকে যেয়ে সেন্টমার্টিনের জাহাজ ধরতে হলে সকাল ৬টায় রওয়ানা দিতে হবে।

ঢাকা থেকে সরাসরি টেকনাফ যেতে চাইলে, ঢাকার ফকিরাপুল ও সায়েদাবাদ থেকে সেন্টমার্টিন, ঈগল, শ্যামলী, গ্রীন লাইন, মডার্ন লাইন, ইত্যাদি বাস সার্ভিসের মাধ্যমে সরাসরি টেকনাফে পৌঁছতে পারবেন। সময় ১০ থেকে ১২ ঘন্টা লাগতে পারে।  


টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন :

সেন্টমার্টিন ভ্রমনের উপযুক্ত সময় হলো নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত।১লা নভেম্বর থেকে টেকনাফ টু সেন্টমার্টিন সমূদ্র পথে জাহাজ চলাচল শুরু হয়।নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে প্রতিদিন সকাল থেকে কেয়ারি ক্রুজ, এম ভি ফারহান,কেয়ারী সিন্দাবাদ, আটলান্টিক ইত্যাদি জাহাজ যাওয়া আসি করে।জাহাজে করে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিনে যেতে সময় লাগে দুই ঘন্টা থেকে আড়াই ঘন্টা। জাহাজের শ্রেনীভেদে যাওয়া আসি ভাড়া ৫৫০ থেকে ১৫০০ টাকা নেয়।জেটি ঘাট থেকে প্রতিদিন জাহাজ গুলি সকাল ৯ টা থেকে ৯.৩০ মিনিটে সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় এবং বিকাল ৩টা থেকে ৩.৩০ মিনিটে সেন্টমার্টিন থেকে ফেরত আসে।সেন্টমার্টিনে যাওয়ার শীপটের টিকিট সাধারনত যাওয়া ও আসা সহ হয়ে থাকে। তাই টিকিট করার সময় উল্লেখ করতে হয় কবে ফিরবেন।আর সময়ের প্রতি কড়া দৃষ্টি রাখতে হবে যেন জাহাজ মিস না হয়। জাহাস সিম হলে ট্রলারে করে ফেড়তে হবে, যা বিপদজনক।

সেন্টমার্টিনে ভ্রমনের ক্ষেত্রে সাধারনত: নভেম্বর থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত জাহাজ চলাচল করে। এ সময় ছাড়া অন্য সময়ে গেলে ট্রলার কিন্বা স্পিটবোট দিয়ো যাতায়াত করতে হবে।শীত মৌসুম ছাড়া অন্য সময়ে সাগর উত্তাল থাকে তাই শীত মৌসুশ ছাড়া অন্য মৌসুমে ভ্রমন নিরাপদ নয়।


সেন্টমার্টিন পরিভ্রমন :

সেন্টমার্টিনে ভ্রমনে গেলে রাত্রি যাপনে নিয়তে যাওয়া ভাল। কারন দিনে গিয়ে দিনে ফিরা কষ্ট সাধ্য। যারা দিনে গিয়ে দিনে ফিরার নিয়ত, তারা সময় নষ্ট না করে জাহাহ থেকে নেমে ভ্যানে করে সরাসরি পশ্চিম সৈকতে আসুন।এখানে আসতে ১৫০ টাকা থেকে ২০০ টাকা ভ্যান ভাড়া নেবে। হেটে গেলেও যেতে পারেন ২০/২৫ মিনেট সময় লাগবে। এই জায়গা পানিতে নামার জন্য ভালো তাই সমূদ্র সৈকতে এসে স্বচ্ছ জলে গোসল করুন মন ভাল লাগবে। এখানে গোসল করার মজাই আলাদা। যাই করেন না কেন আপনাকে মনে রাখতে হবে ২টার আগে আপনাকে ফ্রি হতে হবে নইলে খাওয়ার সময়টুকুও পাবেন না। আর অবশ্যই ৩ টার আগে জাহাজের কাছে আসবেন নইলে জাহাজ মিস করবেন।হাতে সময় থাকলে মেইন সমূদ্র সৈকতের কাছে হুমায়ুন আহমেদের কটেজ দেখে আসতে পারেন। দিনে গিয়ে দিনে ভ্রমনে আপনাকে সময়ের প্রতি সীমাবদ্ধ করে রাখবে তাই অন্তত এক দিনের পরিকল্পনা নিয়ে সেন্টমার্টিনে আসুন মজা পাবেন।

আর যারা একদিনের ভ্রমন অর্থাৎ রাত্রি যাপনের নিয়তে সেন্টমার্টিনে ভ্রমনে আসবেন তারা জাহাস থেকে নেমে কোন হোটেল বা রেস্তোরায় উঠুন। দুপুরের খাবার খেয়ে হালকা বিশ্রাম নিয়ে চলে আসতে পারেন ছেঁড়াদ্বীপ।এখানে সমূদ্রে সূর্য অস্ত যাওয়ার দৃশ্য দেখতে পারবেন।সূর্যস্ত যাওয়া দৃশ্য অসাধারন মনোমুগ্ধকর।সূর্যাস্তের পর বেশি দেরি করবেন না। পায়ে হেটে যেতে ঘন্টা খানেক সময় লাগবে।পায়ে হাটার জন্য অবশ্য বিকেলট ভাল।সেন্টমার্টিন থেকে স্থানীয় মানুষের কাছে ভাটার সময় জেনে নিন।কারন শুধুমাত্র ভাটার সময়ই হেটে যাওয়া যায়। জোযারের সময় ছেড়াদ্বিপ সেন্টমার্টিন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।চাইলে ট্রলারে করে ছেঁড়াদ্বীপ ঘুরে আসতে পারবেন।তারপর সন্ধ্যায় মূল দ্বীপে ফিরে এসে জেটিতে আড্ডা দিতে পারেন। কিন্বা সমূদ্র সৈকতের যে কোন জায়গায় আড্ডা দিতে পারেন।সমূদ্র সৈকতে নিরাপত্ত ভাল তারপরও নিজে সচেতন থাকবেন।পুরো দ্বীপ ঘরে দেখতে হলে ৩-৪ ঘন্টার মত সময় লাগবে।সেন্টমার্টিনের দক্ষিন পশ্চিম অংশের সৌন্দর্য আপনাকে মুগ্ধ করবেই। এই অংশ না দেখেলে সেন্টমার্টিনের প্রকৃত সোন্দর্য অদেখাই রয়ে যাবে। তাই একবার ঘুরে আসুন।সব কিছু ঘুরা শেষে ২ট ৩০ এর মধ্যে নির্ধারিত জাহাজে উঠে পড়ুন।


সেন্টমার্টিনে খাওয়াদাওয়া :

খাওয়াদাওয়ার বিষয়ে সেন্টমার্টিনে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ জিনিস হলো ‘ডাব’।এখানকার ডাবের পানি অত্যন্ত মিষ্টি ও  সুস্বাদু। সেন্টমাটিনে গেলে অন্তত একটি ডাবের পানি পান করা উচিত।আর ভুরি ভোজনের জন্য অনেক হোটেল ও রেস্তোরা আছে।বিশেষ করে হোটেল আল্লার দান, কেয়ারি মারজান রেস্তোরা, বিচ পয়েন্ট,আসাম হোটেল, সি বিচ, কুমিল্লা রেস্টুরেন্ট,সেন্টমার্টিন টুরিস্ট পার্ক, হাজী সেলিম পার্ক, এশিয়া বাংলা হোটেল সহ প্রভৃতি খাবার হোটেল বিদ্যমান।এ গুলোতে বিভিন্ন ধরনের খাবার পাবেন। যারা মাছ খেতে পছন্দ করেন তাদের জন্য সেন্টমার্টিনের কোরাল, ইলিশ,সুন্দরী পোয়া, রুপচাঁদা, লবস্টার,কালাচাঁদ, ইত্যাদি নানান ধরনের স্বাধের খাবার রয়েছে।এছাড়া কুরাও খেতে পারেন। ( দেশী মুরগীকে কুরা বলে ডাকা হয়)। এখানে আরো রয়েছে অফুরন্ত লইট্রা, ঘুড়ি, রুপচাঁদা, কাটকি ইত্যাদি মাছের শুটকি মাছের ভান্ডার যা খেয়ে নিজেকে পরিতৃপ্ত করতে পারেন।


রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা :

সেন্টমার্টিনে রাতে থাকার জন্য বেশ কিছু উন্নতমানের হোটেল ও কটেজ রয়েছে। এছাড়াও অনেক বাড়িতে পর্যটকদের জন্য থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে।উল্লেখযোগ্য কিছু হোটেল ও কটেজ হলো :
ড্রিম নাইট রিসোর্ট : ১৬ রুম বিশিষ্ট এই রিসোর্টে ১২টি ডাবল বেড রুম আছে, যার প্রতিটির ভাড়া প্রতিরাত ২৫০০ টাকা এবং ৪টি কপাল রুমের প্রতিটির ভাড়া ২০০০ টাকা।
সীমানা পেরিয়ে : ১০ রুমের এই হোটেলে প্রতি রুমে ৪ জন করে থাকার সুব্যবস্থা রয়েছে। রুম প্রতি ভাড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা।
প্রিন্স হেভেন : ১৮ রুম বিশিষ্ট এই হোটেলে সিঙ্গেল রুমের ভাড়া ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। আর ডাবল রুমের ভাড়া ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা। যেখানে এক সঙ্গে ৪ জন থাকা যায়।
সমূদ্র বিলাস : লেখক হুমায়ন আহমেদের বাড়ি। এখানে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকায় ৪ রুমের এই বাড়িতে অগ্রিম বুকিং দিয়ে থাকতে পারেন।
এছাড়াও আরো অনেক হোটেল এবং বাড়ি রয়েছে। বাড়ি গুলো খুজলে কম ভাড়াতে পাইতে পারেন।পর্যটন মৌসুমে প্রায় প্রতি বাড়িতে সরাসরি আলাপ করে আবাসিক থাকর সুবিধা পাওয়া যায়। মৌসুম অনুযায়ী ভাড়া কম বেশী হয়। তবে সাধারনত ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় মোটামুটি ভাল রুম পাবেন।


সেন্টমার্টিনে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি সতর্কীকরণ নিদেশনা :

  • সমূদ্র স্নানের পূর্বে জোয়ার ভাটার সময় জেনে নিন।
  • এক হাঁটু পানির নিচে না নামাই শ্রেয়।
  • পানিতে নেমে উত্তেজনার বসে তীর হতে দূরে যাবেন না।
  • প্রাপ্ত বয়স্কদের অনুপস্থিতিতে ছোট ছোট বাচ্চা পানিতে নামা নিষেধ।
  • সাঁতার না জানলে পানিতে নামবেন না।
  • নৌযান চলাচল কালে লাইফ জ্যাকেট পরিধান করুন।
  • একা একা কখনই পানিতে নামবেন না।
  • মনে রাখবেন আপনার জীবনের নিরাপত্তা আপনাকেই নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের সেন্টমার্টিন দ্বীপ একটি অন্যতম পর্যটন স্থান। এখানে হাজার মানুষ প্রতি নিয়ত ভ্রমন করতে আসে।এই স্থান ভ্রমন পিপাসুদের মন হরন করে নেয়।যা অত্যন্ত আকর্ষনীয়। আপনিও আসতে পারেন এই সেন্টমার্টিন  দ্বীপে।তাই আসুন “সেন্টমার্টিন দ্বীপ ভ্রমন করি”।

Post a Comment

0 Comments